আলবার্ট আইনস্টাইন পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম জিনিয়াস। জীবনের শেষ দিকে তিনি তাঁর এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমার কাজের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত সম্মান আমাকে মাঝেমধ্যে খুব অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি বোধহয় একজন প্রতারক।”
শুধু আইনস্টাইন নন, বিখ্যাত লেখিকা মায়া অ্যাঞ্জেলু থেকে শুরু করে চাঁদের বুকে পা রাখা নীল আর্মস্ট্রং—সবারই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে মনে হয়েছে, তারা আসলে যতটা প্রশংসা পাচ্ছেন ততটার যোগ্য নন। একদিন না একদিন চারপাশের মানুষ তাদের এই ‘ফাঁকিবাজি’ ধরে ফেলবে।
আপনারও কি কখনো এমন মনে হয়? কোনো একটি সফলতার পর মনে হয়েছে, “এটা শুধু ভাগ্য”, “আমি আসলে ততটা যোগ্য নই যতটা মানুষ আমাকে ভাবছে”? যদি এমনটা মনে হয়ে থাকে, তবে আপনি একা নন।
আইনস্টাইন বা আর্মস্ট্রংয়ের যে অনুভূতি হয়েছিল, তার একটি মনস্তাত্ত্বিক নাম আছে। নিজের যোগ্যতা নিয়ে তীব্র সন্দেহ, সফল হওয়ার পরেও নিজেকে প্রতারক ভাবার যে মানসিক যন্ত্রণা, সেটিকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ইম্পোস্টার সিনড্রোম (Impostor Syndrome)।
যারা ফ্রানৎস কাফকার The Metamorphosis পড়েছেন, তারা গ্রেগর সামসার সেই অদ্ভুত রূপান্তরের কথা জানেন। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর আবিষ্কার করে, সে এক বিশাল পোকায় পরিণত হয়েছে। ইম্পোস্টার সিনড্রোমে ভোগা মানুষদের অবস্থাও অনেকটা সেরকম। তারা নিজেদের সফলতার জগতে নিজেদেরকেই একজন বহিরাগত বা অযোগ্য মানুষ বলে মনে করতে শুরু করে। তারা প্রতিনিয়ত একটি ভয়ের মধ্যে বাঁচে—এই বুঝি তাদের মুখোশ খুলে গেল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন এমন ভাবে? কেন নিজের অর্জনগুলোকে কেবলই ভাগ্য বা কাকতালীয় বলে মনে হয়?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অনুভূতির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করে।
প্রথমত, আমাদের পারফেকশনিজম বা নিখুঁত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। যারা এই সিনড্রোমে ভোগেন, তারা নিজেদের জন্য অবাস্তব রকমের উচ্চ মানদণ্ড নির্ধারণ করে রাখেন। তারা মনে করেন, কোনো কাজে ১০০-তে ১০০ না পেলে সেই কাজটির কোনো মূল্য নেই। ৯৯ পেলেও তাদের মনে হয় তারা ব্যর্থ। এই ‘সবটুকুই চাই’ মানসিকতা তাদের প্রতিনিয়ত ভেতর থেকে ক্ষয় করে।
দ্বিতীয় কারণটি লুকিয়ে আছে আমাদের আধুনিক জীবনযাপনে, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে চারপাশে শুধু সফলতার গল্প। নিউজফিড স্ক্রল করলেই দেখা যায়—কেউ দারুণ চাকরি পাচ্ছে, কেউ বিদেশে যাচ্ছে, কেউবা নতুন স্টার্টআপ খুলেছে।
এই পারফেকশনের প্রতিযোগিতায় যখন কেউ নিজে সামান্য কোনো সাফল্য অর্জন করে, তখন তার অবচেতন মন তাকে বলতে থাকে, “তুমি তো ওদের মতো পারফেক্ট নও। তোমার পথচলায় এত মসৃণতা ছিল না। তুমি নিশ্চয়ই কোনোভাবে ফাঁকি দিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছ।”
মানুষ আসলে অন্যের ‘হাইলাইট রিল’-এর সঙ্গে নিজের ‘বিহাইন্ড দ্য সিন’-এর তুলনা করে। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় ইম্পোস্টার ফিলিংস।
এই মানসিক অবস্থা থেকে জন্ম নেয় অদ্ভুত সব আচরণ। কেউ কেউ অতিরিক্ত কাজ করা শুরু করে। তারা ভাবে, “আমি যেহেতু আসলেই যোগ্য নই, তাই আমাকে অন্যদের চেয়ে দ্বিগুণ পরিশ্রম করে এই অভাব পূরণ করতে হবে।” এর ফলাফল হয় ভয়াবহ বার্নআউট—মানসিক ও শারীরিক অবসাদ।
আবার আরেকদল মানুষ ভয়ের কারণে কোনো নতুন কাজই শুরু করতে চান না। তারা ভাবেন, “শুরু করলেই তো সবাই বুঝে যাবে আমি আসলে কিছুই পারি না।” ফলে তারা প্রক্রাস্টিনেশনের এক অন্তহীন চক্রে আটকে পড়েন।
তবে আশার কথাও আছে। এই ভয়ানক সিনড্রোমের সঙ্গে লড়াই করে জয়ী হওয়া সম্ভব।
সাইকোলজিস্টরা বলছেন, ইম্পোস্টার সিনড্রোম কোনো মানসিক রোগ নয়। এটি একটি মানসিক অবস্থা মাত্র। কিছু সচেতন পদক্ষেপ নিলে এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা যায়।
প্রথমেই মেনে নিতে হবে যে আপনি একা নন। গবেষণা বলছে, পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময় এই সিনড্রোমের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। যখন আপনি জানবেন যে এই অনুভূতি শুধু আপনার নয়, তখন আপনার ভেতরের ভয় অনেকটাই কমে যাবে।
নিজের এই অনুভূতিগুলোকে লুকিয়ে না রেখে বিশ্বস্ত কারো সঙ্গে এগুলো নিয়ে কথা বলতে শেখাটা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, নিজের সফলতার একটি ট্র্যাক রেকর্ড রাখুন। ডায়েরিতে কিংবা ফোনের নোটে লিখে রাখুন আপনার ছোট-বড় সব অর্জনের কথা। যখনই মনে হবে, “আমি অযোগ্য”, তখন নিজের অতীতের অর্জনগুলোর দিকে ফিরে তাকান। যুক্তি দিয়ে নিজের আবেগকে প্রশ্ন করুন।
নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—“আমি যদি সত্যিই এতটা অযোগ্য হতাম, তাহলে এতগুলো ধাপ কীভাবে পার হলাম? শুধু ভাগ্য দিয়ে কি এতদূর আসা সম্ভব?”
আর সবচেয়ে বড় কথা, পারফেক্ট হওয়ার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে। ভুল করার স্বাধীনতা নিজেকে দিতে হবে। আমরা মানুষ, যন্ত্র নই। আমাদের কাজে ভুল থাকবে, ত্রুটি থাকবে—এটাই তো স্বাভাবিক।
আমেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্ট বলেছিলেন, “The best way out is always through.” অর্থাৎ, কোনো ভয়কে অতিক্রম করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যাওয়া।
যেদিন আপনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলতে পারবেন—
“হ্যাঁ, আমি সব জানি না। আমারও ভুল হয়। কিন্তু আমি শিখছি। আমি একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি।”
সেদিনই আপনি ইম্পোস্টার সিনড্রোমের শৃঙ্খল থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হতে শুরু করবেন।
By-Redwan Hushen
Founder of Redwan Method ,CEO
