1872 সালের ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসের কোন এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাই অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ড শহরের তেল শোধনাগারের মালিকদের মধ্যে এক চরম এবং সশুদ্ধকর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যারা কয়েকদিন আগেও নিজেদের স্বাধীন এবং লাভজনক ব্যবসায়ী ভাবতো তারা হঠাৎ করে আবিষ্কার করল তাদের ব্যবসা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। রাতারাতি ট্রেনের মাধ্যমে তেল পরিবহনের খরচ দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে রেলওয়ে কোম্পানিগুলো। এই বাড়তি ভাড়ায় তেল পাছালে প্রতিটি স্বাধীন তেল শোধনাগারের মালিক দেউলিয়া হয়ে যাবে।
তারা যখন দেশেহারা হয়ে রেলওয়ে কোম্পানিগুলোর কাছে এর কারণ জানতে চাইল তখন অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলো এক ভয়ঙ্কর সত্য। রেলওয়ে কোম্পানিগুলো একাই কাজ করেনি। এই পুরো চক্রান্তের পেছনে রয়েছে সাউথ ইম্প্রুভমেন্ট কোম্পানি নামের একটি রহস্যময় ছায়া সংগঠন। আর এই সংগঠনের মূল কারিগর মাত্র 33 বছর বয়সী এক শান্ত ধীরস্থির এবং চরম হিসেবী তরুণ ব্যবসায়ী জন রকফেলার। রকফেলার ক্লিভল্যান্ডের 26 জন স্বাধীন তেল শোধনাগারের মালিকের কাছে একটি চরমপত্র পাঠালেন। প্রস্তাবটি ছিল অত্যন্ত সোজা কিন্তু ভয়াবহ। হয় তোমাদের কোম্পানি আমার
কাছে বিক্রি করে দাও আর নয়তো চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাও। মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে 26 টি কোম্পানির মধ্যে 22 টি কোম্পানি রকফেলারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ইতিহাসে এই ঘটনাটি পরিচিত ক্লিভল্যান্ড ম্যাসাকার নামে। কেতু কিভাবে? একজন সামান্য বুককিপার বা হিসাবরক্ষক থেকে শুরু করে কিভাবে জন ডেভিসন রংফেলার পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মনোপলি বা একচেটিয়া সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। কিভাবে তিনি আমেরিকার রেলওয়ে ব্যারনন্দের নিজের হাতের পুতুলে পরিণত করেছিলেন। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল নামক যে দানবীয় কর্পোরেশনটি তিনি তৈরি করেছিলেন
তা কিভাবে পুরো মার্কিন সরকারকে নিজের পকেটে পুড়ে ফেলেছিল। আর কেনইবা মার্কিন সুপ্রিম কোর্টকে বাধ্য হয়ে এই বিশাল সাম্রাজ্যকে ভেঙে 34 টুকরো করে ফেলতে হয়েছিল। এসব প্রশ্নেরই উত্তর জানার চেষ্টা করব আদ্যপান্তর আজকের পর্বে। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝির সময়। তখনো বিশ্বে বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কার হয়নি। রাতের বেলা ঘর আলোকিত করার জন্য মানুষ ব্যবহার করত তিমি মাছের চর্বি থেকে তৈরি তেল বা ক্যাম্পিন। কিন্তু তিমির তেলের দাম ছিল আকাশছোঁয়া। যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ঠিক এই সময়ে 1859 সালে পেনসিলভেনিয়ার টাইটটাসভল নামক এক অখ্যাত
গ্রামে এডুইন রেক নামের এক ব্যক্তি মাটির নিচ থেকে প্রথমবারের মতো অপরিশোধিত তেল বা রকওয়েল উত্তোলনে সক্ষম হন। এই আবিষ্কার পুরো আমেরিকায় এক অভাবনীয় উন্মাদনার জন্ম দেয়। যাকে বলা হয় পেনসিলভেনিয়া অয়েল রাশ। হাজার হাজার মানুষ রাতারাতি বড়লোক হওয়ার আশায় পেন্সিলভেনিয়ার কাদা আর কাদায় ভরা জঙ্গলগুলোতে ছুটে আসতে থাকে। যত্রতত্র তেলের কূপ খনন করা শুরু হয়। কিন্তু এই তেলের খনিগুলোতে কোন শৃঙ্খলা ছিল না। আজ তেলের দাম হয়তো ব্যারেল প্রতি 10 ডলার। কাল হয়তো তা নেমে দাঁড়ালো 10 সেন্টে। এই চরম বিশৃঙ্খলা এবং
অস্থিরতার সময়ে ওয়াহিওর ক্লিভল্যান্ড শহরে বসে সবকিছু খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন 23 বছর বয়সী এক তরুণ জন রফেলের। রকফেলারের শৈশব ছিল অত্যন্ত অদ্ভুত এবং কষ্টে ভরা। তার বাবা উইলিয়াম এভরি রকফেলার ছিলেন একজন পেশাদার প্রতারক এবং ক্যানভাসার। যাকে মানুষ ডেভিল বিল বলে ডাকত। তিনি নিজেকে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ দাবি করে সাধারণ মানুষের কাছে ভুয়া ওষুধ বিক্রি করতেন। তিনি তার সন্তানদের সাথেও প্রতারণা করতেন। যাতে তারা পৃথিবীর বাস্তবতার কঠিন রূপটি শিখতে পারে। বাবার এই প্রতারণা এবং মায়ের কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন রফেলারকে অত্যন্ত হিসেবী ধীরস্থির
এবং আবেগমুক্ত একজন মানুষে পরিণত করেছিল। রফেলা বুঝতে পেরেছিলেন তেলের কূপ খনন করাটা বোকাদের কাজ। এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ। আজ তেল আছে কাল নেই। আসল ব্যবসা লুকিয়ে আছে তেল পরিশোধন বা রিফাইনিং এর মধ্যে। অপরিশোধিত তেল মানুষের কোন কাজে আসে না। এই তেলকে শোধন করে কেরোসিন তৈরি করলেই তা সাধারণ মানুষের ঘরে আলো জ্বালাতে পারবে। 1863 সালে রফেলার তার পার্টনার মরিস ক্লার্কের সাথে মিলে ক্লিভল্যান্ডে একটি ছোট তেল শোধনাগার বা রিফাইনারি স্থাপন করেন। আর এখান থেকে শুরু হয় এক মহাকাব্যিক কর্পোরেট চ্যাপ্টার। প্রথম থেকেই রকফেলারের ব্যবসার দর্শন ছিল
সবার চেয়ে আলাদা। সেই যুগে বেশিরভাগ তেল শোধনাগারের মালিক ছিল অদূরদর্শী। তারা কেরোসিন তৈরি করার পর অপরিশোধিত তেলের বাকি বর্য বা বাইপ্রোডাক্টগুলো যেমন গ্যাসোলিন বা ন্যাপটা নদীতে ফেলে দিত। যার ফলে প্রায়ই নদীতে আগুন লেগে যেত। কিন্তু রকফেলার ছিলেন চরম মৃতবেই। তিনি এক ফোঁটা তেলও অপচয় হতে দিতেন না। তিনি কেরোসিন তৈরি করার পর অবশিষ্ট বর্য দিয়ে লুব্রিগেটিং অয়েল, পেট্রোলিয়াম চেলি। যা পরে পরিচিত হয় ভেসলিন নামে মোমবাতি এবং আলকাত্রে তৈরি করে বিক্রি করতে শুরু করলেন। এমনকি তিনি তার কারখানার জন্য ব্যারেল বা কাঠের ড্রাম অন্য জায়গা থেকে
না কিনে নিজের কারখানা দিয়ে তৈরি করা শুরু করলেন। এতে তার ব্যারেল প্রতি খরচ আড়াই ডলার থেকে নেমে দাঁড়ালো মাত্র 96 সেন্টে। এই চরম দক্ষতা এবং শৃঙ্খলার কারণে রকফেলারের উৎপাদন খরচ অন্য সবার চেয়ে বহু গুণে কমে যায়। 1870 সালের 10ই জানুয়ারি তিনি তার ভাই উইলিয়াম রকফেলার এবং পার্টনার হেনরি ফ্ল্যাগলারকে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করেন স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি। এখানে স্ট্যান্ডার্ড বা মানসম্মত নামটি কেবল নামই ছিল না। সে যুগে কেরোসিনের মান ছিল খুবই খারাপ। প্রায়ই অপরিশোধিত এবং দাজ্য কেরোসিন ল্যাম্পের ভেতর বিস্ফরিত হয়ে মানুষের ঘরবাড়ি পড়ে
যেত। রফেলার তার গ্রাহকদের এই গ্যারান্টি দিলেন যে স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের কেরোসিন সবসময় এক মানের এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ। এই নামের জোরে এবং দক্ষতায় স্ট্যান্ডার্ড অয়েল খুব দ্রুতই ক্লিভল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শোধনাকারে পরিণত হয়। কিন্তু রফেলারের স্বপ্ন ক্লিভল্যান্ডের সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি চাইছিলেন পুরো আমেরিকার তেলের বাজার একা নিয়ন্ত্রণ করতে। আর তার এই স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ালো সে যুগের আরেক দানব রেলপথ বা রেলওয়ে কোম্পানিগুলো। আমেরিকা তখন তেলের খনি ছিল পেন্সিলভেনিয়ায়। শোধনাগার ছিল
ক্লিভল্যান্ড এবং পিটসবার্গে। আর বাজার ছিল নিউইয়র্ক এবং পূর্ব উপকূলে। এই বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে তেল পরিবহনের একমাত্র উপায় ছিল রেলগাড়ি। সে সময় আমেরিকা রেলপথ নিয়ন্ত্রণ করত তিনজন মহাশক্তিদর রেলওয়ে ব্যারন। নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল রেলওয়ের কার্নেলিয়াস ভেন্ডারবিট, পেন্সিলভেনিয়া রেলরোডের টম স্কট এবং এরই রেলরোডের জেগোল্ড। আবার এই রেলওয়ে কোম্পানিগুলোর মধ্যে ছিল চরম প্রতিযোগিতা। রকফেলার এই প্রতিযোগিতার সুযোগটি নিলেন চরম ধুরন্তরতার সাথে। তিনি রেলওয়ে কোম্পানিগুলোর কাছে গিয়ে একটি গোপন প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের
প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ তেলের ব্যারেল দেব। যা অন্য কোন রিফাইনারি দিতে পারবে না। কিন্তু এর বিনিময়ে তোমাদের আমাকে গোপন ডিসকাউন্ট বা রিবেট দিতে হবে। রেলওয়ে মালিকরা এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু রকফেলারের মাস্টার স্ট্রোক এখানেই শেষ ছিল না। 1871 সালের শেষের দিকে রকফেলার এবং রেলওয়ে মালিকরা মিলে গোপনে গঠন করলেন সাউথ ইম্প্রুভমেন্ট কোম্পানি। এই কোম্পানির নিয়মটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে অনাজ্য এবং মাফিয়া স্টাইলের একটি ব্যবসায়িক চুক্তি। চুক্তি অনুযায়ী রেলওয়ে কোম্পানিগুলো স্ট্যান্ডার্ড অয়েলকে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে বিশাল ছাড়
দেবে। স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের প্রতিদ্বন্দী কোম্পানিগুলোর জন্য রেল ভাড়া দ্বিগুণ করে দেয়া হবে এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো প্রতিদ্বন্দী কোম্পানিগুলো যে বর্থিত ভাড়া দেবে সেই ভাড়ার একটা বড় অংশ ড্রব্যাক হিসেবে সোজা রকফেলারের পকেটে চলে আসবে। অর্থাৎ রকফেলারের প্রতিদ্বন্দীরা যত বেশি তেল পরিবহন করবে রফেলার ঘরে বসেই তত বেশি টাকা আয় করবেন। এই চুক্তিটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই স্বাধীন তেল শোধনাগার গুলোর জন্য মৃত্যু পরোয়ানা। এই চুক্তির খবর যখন ফাঁস হয়ে যায় তখন ক্লিভল্যান্ডের অন্যান্য তেল শোধনাগারের মালিকরা আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়ে। ঠিক
এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছিলেন রকফেলার। ভিডিও শুরুতেই যে ক্লিভল্যান্ড ম্যাসাকার বা ক্লিভল্যান্ড গণহত্যার কথা বলেছিলাম তাই চুক্তির ভয় দেখেই করা হয়েছিল। রফেলার তার প্রতিদ্বন্দীদের অফিসে গিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলতেন, আপনার ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ। আপনি আমার কাছে কোম্পানি বিক্রি করে দিন। আমি আপনাকে স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের শেয়ার দেব অথবা নগদ টাকা দেব। বিক্রি না করলে আপনি ধ্বংস হয়ে যাবেন। বেশিরভাগ মালিকই ভয় পেয়ে তাদের কোম্পানি পানির দামে রকফেলারের কাছে বিক্রি করে দেয়। যারা বিক্রি করেনি রকফেলার অত্যন্ত নির্মমভাবে তেলের দাম
কমিয়ে তাদের বাজার থেকে চিরতরে মুছে দেন। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ক্লিভল্যান্ডের তেলের বাজার পুরোপুরি রকফেলারের একক নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ক্লিভল্যান্ড দখলের পর রকফেলার এবার নজর ঘোরালেন পুরো আমেরিকার দিকে। তিনি একে একে পিটসবার্গ, ফিলাডেলফিয়া এবং নিউইয়র্কের বড় বড় শোধনাগার গুলো কিনতে শুরু করলেন। তার এই কৌশলকে অর্থনীতিতে বলা হয় হরিজন্টাল ইন্টেগ্রেশন। অর্থাৎ একই ধরনের ব্যবসা যেমন সব শোধনাগার কিনে নিয়ে একটি একচেটিয়া বাজার তৈরি করা। কিন্তু রকফেলারেরই আগ্রাসী রূপে ভয় পেয়ে গেলেন খোদ রেলওয়ে ব্যারনরা। বিশেষ করে
পেন্সিলভেনিয়া রেল রোডের মালিক টম স্কড বুঝতে পারলেন যে রকফেলার এত বড় দানব হয়ে উঠেছেন যে তিনি চাইলে পুরো রেলওয়ে খাতকেও জিম্মি করে ফেলতে পারেন। টম স্কড রকফেলারের একচেটি আধিপত্য ভাঙ্গার জন্য নিজেই তেল পরিশোধন ব্যবসায় নামার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং পেন্সিলভেনিয়া স্বাধীন তেল উত্তোলকদের সাথে হাত মেলালেন। রকফেলার এই ঘটনাকে দেখলেন তার সাম্রাজ্যের উপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে। তিনি টম স্কট কে ধ্বংস করার জন্য এক অভিনব এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিলেন। তিনি ভাবলেন রেলওয়ের উপর নির্ভর করাই তো আমার দুর্বলতা। যদি আমি তেলের খুনি থেকে
শোধনাগার পর্যন্ত সরাসরি পাইপলাইন বসিয়ে ফেলি তবে রেলগাড়ির আর কোন প্রয়োজনই থাকবে না। শুরু হলো ইতিহাসের বিখ্যাত পাইপলাইন ওয়ার্ড বা পাইপলাইন যুদ্ধ। রফেলার গোপনে হাজার হাজার মাইল লম্বা তেলের পাইপলাইন বসাতে শুরু করলেন। এটি ছিল সে যুগের একটি বিষয়কর প্রযুক্তিগত সাফল্য। রেলওয়ে কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা বাঁচানোর জন্য ভাড়াগুন্ডা লাগিয়ে রকফেলারের পাইপলাইন ভাঙার চেষ্টা করল। কিন্তু রকফেলারের সম্পদের পাহাড় এবং সংগঠনের সামনে তারা দাঁড়াতেই পারলো না। পাইপলাইন চালু হওয়ার পর রেলপথে তেল পরিবহন প্রায় শূন্যের কোঠায়
নেমে এল। অর্থাৎ চরম আর্থিক লোকসানে পড়লো টম স্কটের পেন্সিলভেনিয়ায় রেলরোড। স্কটনিজেও মানসিক ও আর্থিকভাবে ভেঙে পড়েন। পাইপলাইন তৈরির মাধ্যমে রফেলা তার ব্যবসার মডেলকে সম্পূর্ণ বদলে দিলেন। তিনি তখন শুধু শোধনাগাড়ি কিনছিলেন না। তিনি তেলের খনি, পাইপলাইন, তেলবাহী রেলবগি, গোদাম ঘর এবং বিক্রয় কেন্দ্র। সবকিছুই নিজের দখলে নিয়ে নিচ্ছিলেন। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ভার্টিকাল ইন্টিগ্রেশন। অর্থাৎ তেল তোলা থেকে শুরু করে একজন সাধারণ মানুষের ঘরের ল্যাম্পে কেরোসিন পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি ধাব স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের
একক নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। 1880র দশকের শুরুতে জন্ডি রফেলার আমেরিকার রিফাইনড অয়েলের প্রায় 90 শতাংশ বাজার একাই নিয়ন্ত্রণ করতেন। কিন্তু এই বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি এক বিরাট আইনি সমস্যার মুখে পড়েন। সে যুগে আমেরিকার কর্পোরেট আইনগুলো ছিল অত্যন্ত করা। ওহাই অঙ্গরাজ্যের আইনে পরিষ্কার বলা ছিল যে ওহাইতে নিবন্ধিত কোন কোম্পানি অন্য কোন অঙ্গরাজ্য যেমন নিউইয়র্ক বা পেনসিলভেনিয়ার কোম্পানির শেয়ার কিনতে বা মালিকানা নিতে পারবে না। কিন্তু রফেলারের স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল তো পুরো আমেরিকায় ছড়িয়েছিল। তাহলে আইনিভাবে তিনি কিভাবে
এই বিশাল সাম্রাজ্যের মালিকানা দাবি করবেন। এই চরম সংকটের মুহূর্তে ত্রাতা হয়ে এলেন রকফেলারের অত্যন্ত ধুরন্তর আইনজীবী স্যামুয়েল ডরড। ড এক অভিনব এবং চতুর আইনি ফাক বা লুপহোল বের করলেন। তিনি উদ্ভাবন করলেন কর্পোরেট ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত এক আইনি কাঠামো দ্যা ট্রাস্ট। 1882 সালে গঠন করা হয় স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ট্রাস্ট। নিয়মটি ছিল এমন ওভাইও, নিউইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া বা অন্য যেকোন অঙ্গরাজ্যে থাকা স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের ছোট বড় সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোর শেয়ার তাদের মূল মালিকদের হাতে থাকবে না। এই শেয়ারগুলো ক্রাস্টি বোর্ড নামের নয়
জন ব্যক্তির হাতে ন্যাস্ত করা হবে। এই নয় জনের প্রধান হবেন স্বয়ং জন রকফেলার। বিনিময়ে মূল মালিকদের একটি ট্রাস্ট সার্টিফিকেট দেয়া হবে। যা দিয়ে তারা লোভংশ পাবেন। এই জাদুকরী আইনি কাঠামোর ফলে কাগজে কলমে ওয়াইর স্ট্যান্ডার্ডওয়েল কোম্পানি অন্য কোন অঙ্গরাজ্যের কোম্পানির মালিক হলো না। কিন্তু বাস্তবে ওই নয় জন ট্রাস্টটি নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে 26 ব্রাউডের একটি গোপন অফিসে বসে পুরো আমেরিকার তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেন। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ট্রাস্ট ছিল একটি ছায়া সরকার। একটি অদৃশ্য সাম্রাজ্য। যাকে
কোন একক অঙ্গরাজ্যের আইন দিয়ে ধরা সম্ভব ছিল না। এই ট্রাস্ট মডেলটি এতই সফল হয়েছিল যে পরবর্তীতে আমেরিকার অন্যান্য শিল্পেও যেমন সুগার ট্রাস্ট, টোবাকো ট্রাস্ট, স্টিল ট্রাস্ট এই একই মডেল অনুসরণ করে একচেটে মনোপলি গড়ে তোলা হয়। রকফেলারের এই ট্রাস্ট হয়ে ওঠে আমেরিকান পুঁজিবাদের সবচেয়ে পরাক্রমশালী এবং অধম্যতা। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে জন রকফেলার ছিলেন আমেরিকার সবচেয়ে ধনী এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তি। কিন্তু একই সাথে তিনি ছিলেন আমেরিকার সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ। সাধারণ মানুষ স্বাধীন ব্যবসায়ী এবং কৃষকরা বুঝতে পারছিল যে স্ট্যান্ডার্ড
অয়েলের মতই রাক্ষসী কর্পোরেশনগুলো আমেরিকার মুক্তবাজার অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তারা রাজনৈতিক নেতাদের কিনে রাখতো এবং ইচ্ছেমত পণ্যের দাম বাড়াতো বা কমাতো। রফেলার তার পুরো জীবন অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে কাটিয়েছিলেন। তিনি কখনো সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতেন না। কিন্তু তার এই দুর্ভেদ্য এবং গোপন সাম্রাজ্যের দেয়ালে প্রথম এবং সবচেয়ে বড় ফাটলটি ধরিয়েছিলেন একজন নারী সাংবাদিক আইডা টারবেল। রকফেলারের উপর আইডা টারবেলের এক ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল। আইডার বাবা ছিলেন পেন্সিলভেনিয়ার একজন স্বাধীন তেল উৎপাদক।
1872 সালে সে বিখ্যাত সাউথ ইম্প্রুভমেন্ট কোম্পানির চক্রান্ত এবং রকফেলারের আগ্রাসী নীতির কারণে আইডার বাবার ব্যবসা চিরতরে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আইডা তার বাবার সেই হতাশা এবং কান্না ছোটবেলায় নিজের চোখে দেখেছিলেন। 1902 সালে আইডা ডটারবেল ম্যাকলিওরস ম্যাগাজিনে কাজ করার সময় স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের উপর একটি অনুসন্ধানের রিপোর্ট করার সিদ্ধান্ত নেন। আইডা বছর পর বছর ধরে গোপন নথিপত্র, আদালতের পুরনো রেকর্ড, ট্রেনের মালপত্রের রশিদ এবং রফেলারের দ্বারা সর্বশান্ত হওয়া ব্যবসায়ীদের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করেন। তিনি অত্যন্ত নিখুঁত এবং যুক্তি নির্ভর ভাবে
স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের অন্ধকার দিকগুলো যেমন রেলওয়ে রিবের চক্রান্ত স্পাই বা গুপ্তচর ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ব্যবসার তথ্য চুরি করা এবং দাম কমিয়ে তাদের বাজার থেকে ঘটিয়ে দেওয়া সব গোপন কৌশল প্রমাণসহ জনগণের সামনে তুলে ধরেন। এই রিপোর্টগুলো দ্য হিস্ট্রি অফ দ স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি নামে 1904 সালে একটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। এটি ছিল মাকরেকিং বা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ইতিহাসের এক মাস্টারপিস। আই চারবেলের এই বই পুরো আমেরিকায় এক প্রবল জনরসের বিস্ফোরণ ঘটায়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদরা বুঝতে
পারেন যে রকফেলারের সাম্রাজ্য কোন জাদু বলে নয় বরং চরম প্রতারণা এবং বেয়নী কাজের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। জন্ডি রকফেলার এই রিপোর্টগুলো পড়ে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী তিনি প্রকাশ্যে কোন জবাব দেননি। তিনি আইডিয়াকে তাচছিল্য করে বলতেন মিস টার ব্যারেল অর্থাৎ আলকাটার ব্যারেল। কিন্তু রকফিলার বুঝতে পারেনি যে এই এক নারী সাংবাদিকের কলমের জোর তার মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। আইজা টারবেলের রিপোর্টের পর আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গন নড়েচড়ে বসে। সে সময় ক্ষমতায় আসেন প্রেসিডেন্ট থিওড রুজবেল্ট।
যিনি ট্রাস্ট বাস্টার বা মনোপলি ধ্বংসকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রুজবেল প্রশাসন 1890 সালে পাশ হওয়া শারম্যান ইনটু ট্রাস্ট অ্যাক্ট ব্যবহার করে স্ট্যান্ডার্ড ওয়েলের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক মামলা দায়ের করে। অভিযোগ ছিল একটাই। স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল স্বাধীন বাণিজ্যে বাধা দিচ্ছে এবং বেয়নীভাবে একচেটিয়ে মনোপলি তৈরি করেছে। মামলাটি বছরের পর বছর ধরে আমেরিকার নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। পুরো আমেরিকার উদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় কর্পোরেট বিচারের রায়ের জন্য। অবশেষে 191 সালের 15ই মে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এক
যুগান্তকারী এবং ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে। প্রধান বিচারপতি এডোয়ার্ড ডি হোয়াইট তার রায় ঘোষণা করেন যে স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল ট্রাস্ট একটি বেআইনি মনোপলি এবং এটি শারম্যান এন্ট্রি ট্রাস্ট অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে। আদালত নির্দেশ দেয় যে স্ট্যান্ডার্ডওয়েল কোম্পানিকে ভেঙে অন্তত 34 টি আলাদা এবং স্বাধীন কোম্পানিতে বিভক্ত করতে হবে। এই রায়ের ফলে তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে রকফেলারের 41 বছরের তিলে তিলে গড়া সাম্রাজ্য। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ভেঙে যে কোম্পানিগুলোর জন্ম হয় সেগুলো আজ আমাদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত নাম। যেমন
স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অফ নিউজার্সি যা বর্তমানে এক্সন। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অফ নিউইয়র্ক যা বর্তমানে মোবিল এবং স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অফ ক্যালিফোর্নিয়া যা বর্তমানে শেবরন। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে অনেকেই আমেরিকার মুক্তবাজার অর্থনীতির বিশাল জয় হিসেবে উদযাপন করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং চরম প্রহষণটি অপেক্ষা করছিল এই রায়ের ঠিক পরেই। সুপ্রিম কোর্ট হয়তো ভেবেছিল তারা রকফেলারকে শাস্তি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই রায় রকফেলারকে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী মানুষে পরিণত করেছিল। কিভাবে? স্ট্যান্ডার্ড অয়েল যখন একটি অখন্ড
কোম্পানি ছিল তখন তার শেয়ারের দাম বাজারে নিয়ন্ত্রণের কারণে কিছুটা অবমূল্যায়িত ছিল। কিন্তু যখন একে 34 টি ছোট এবং স্বাধীন কোম্পানিতে ভাগ করে শেয়ার বাজারে ছাড়া হলো তখন বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারলো যে এই প্রতিটি কোম্পানির আলাদা আলাদা মূল্য অনেক বেশি। রাতারাতি 34 টি বেবি স্ট্যান্ডার্ডস বা ছোট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম রকেটের মত বাড়তে শুরু করল। যেহেতু জন্ডি রফেলের কাছে মূল স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের 25 শতাংশ শেয়ার ছিল তাই আইন অনুযায়ী তিনি নতুন 34 টি কোম্পানির প্রতিটির 25 শতাংশ শেয়ারের মালিক হলেন। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে এই
ভাঙ্গনের ফলে রকফিলারের ব্যক্তিগত সম্পদ প্রায় তিন গুণ বেড়ে গিয়ে 900 মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। যা তৎকালীন আমেরিকার জিডিপির প্রায় 2 শতাংশ ছিল। বর্তমান মূল্যে হিসেব করলে তার সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় 400 বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। যা ইলন মাস্ক বা জে বেজোসের আজকের সম্পদের চেয়েও বহুগুণ বেশি। ওয়াল স্ট্রিটের অনেকেই সে সময় মজা করে বলতেন হে ঈশ্বর আমাকে আরো একবার সুপ্রিম কোর্টের এমন শাস্তি দাও। জন্ডি রকফেলারের জীবনের শেষ দিকটা ছিল তার প্রথম জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত। 1911 সালে কোম্পানি ভেঙে যাওয়ার অনেক আগেই 1897
সালের দিকে তিনি ব্যবসার দৈনন্দিন কাছ থেকে অবসর নিয়েছিলেন। জীবনের শেষ 40 বছর তিনি তার বিশাল সম্পদের একটি বড় অংশ দান করে কাটিয়েছেন। তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণার জন্য রকেলার ইনস্টিটিউট ফর মেডিকেল রিসার্চ তৈরি করেন এবং ইয়েলো ফিভার বা পিচরের মত রোগ নির্মূলে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার দান করেন। আধুনিক ফিলান্থ্রপি বা জনহিত সে কাজের ধারণাই মূলত রকফেলার এবং এন্ড্রু কার্নিগির হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু রকফেলারের আসল উত্তরাধিকার কি শুধু তার দানশীলতা? না। জন রকফেলার পুরো
বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে একটি প্রাইভেট কর্পোরেশন কতটা নিখুত, কতটা শক্তিশালী এবং কতটা নির্মম হতে পারে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে যদি আপনি একটি শিল্পের পুরো সাপ্লাই চেইন কাঁচামাল থেকে শুরু করে রিটেল মার্কেট পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তবে আপনি আক্ষরিক অর্থে একটি দেশের অদৃশ্য সরকারে পরিণত হতে পারবেন। রফেলার রাজ নেই। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত সেই কর্পোরেট আগ্রাসন একত্রীকরণ এবং একচেটে সাম্রাজ্যবাদের ব্লুপ্রিন্ট আজও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা বিশ্ব পুঁজিবাদের শিরায় শিরায় বইছে।
-আদ্যোপান্ত
