রোমান সাম্রাজ্যের পতনের অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি কারণ নিয়ে ইতিহাসবিদরা আজও আলোচনা করেন—Brain Drain। শুধু রোম নয়, ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি সভ্যতাই এমন একটি সময়ের মুখোমুখি হয়েছে, যখন তাদের সবচেয়ে মেধাবী মানুষগুলো হয় অন্যত্র চলে গেছে, নয়তো নিজেদের সামর্থ্যের পূর্ণ বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পায়নি। সভ্যতা কখনো শুধু যুদ্ধ হেরে ধ্বংস হয় না; কখনো কখনো সে তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হারিয়েও ধ্বংস হয়।
আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে রোম তার প্রকৌশলী, দার্শনিক এবং দক্ষ প্রশাসকদের হারিয়েছিল। মধ্যযুগে মুসলিমদের স্বর্ণযুগের অবসানের অন্যতম কারণ ছিল জ্ঞানচর্চার পরিবেশের ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যাওয়া। ইউরোপের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে হাজার হাজার বিজ্ঞানী দেশান্তরী হয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মানি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক শক্তি ছিল। কিন্তু নাৎসি নীতির কারণে আলবার্ট আইনস্টাইনসহ অসংখ্য বিজ্ঞানী জার্মানি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। ইতিহাসের পরিহাস হলো, সেই বিজ্ঞানীরাই পরবর্তীতে অন্য রাষ্ট্রের উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন।
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কখনো তার প্রাকৃতিক গ্যাস, স্বর্ণ কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গ্রাফ নয়। তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার তরুণদের কল্পনাশক্তি, শ্রম এবং মেধার উপর দাঁড়িয়ে।
কিন্তু একটি জাতির জন্য সবচেয়ে ভয়ের বিষয়টি কী জানেন? যখন তার তরুণরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা শুরু করে অন্য একটি দেশের মানচিত্র হাতে নিয়ে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্ম ঠিক এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
অদ্ভুত বিষয় হলো, তারা কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রে বাস করছে না। তারা দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত নয়। তাদের দেশ অর্থনৈতিকভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর একটিও নয়। তবুও বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণ প্রতিদিন IELTS-এর vocabulary মুখস্থ করছে, GRE-এর প্রস্তুতি নিচ্ছে, scholarship-এর জন্য Statement of Purpose লিখছে, LinkedIn-এ বিদেশি চাকরির জন্য আবেদন করছে কিংবা YouTube-এ "How to settle in Canada" সার্চ করছে।
তারা দেশটাকে ঘৃণা করে না। বরং সমস্যাটা আরও বেশি বেদনাদায়ক। তারা দেশটাকে ভালোবাসে, কিন্তু নিজেদের ভবিষ্যৎকে ভালোবাসার জন্য হয়তো এই দেশটাকে ছেড়ে যাওয়াকেই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত মনে করছে।
আমরা এই ঘটনাকে খুব সহজ একটি শব্দে প্রকাশ করি—"মেধাপাচার"।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, মেধাপাচার আসলে কোনো রোগ নয়। এটি একটি উপসর্গ মাত্র। আসল রোগটির নাম—Burnout।
আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করেছি, যারা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগিতার মধ্যে বেড়ে উঠছে এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে দ্রুত মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে।
একজন বাংলাদেশি শিশুর জীবনের প্রথম যুদ্ধ শুরু হয় প্লে-গ্রুপে ভর্তি হওয়ার সময়। তারপর শুরু হয় GPA-5-এর যুদ্ধ, অলিম্পিয়াডের যুদ্ধ, কোচিংয়ের যুদ্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যুদ্ধ, চাকরির যুদ্ধ, BCS-এর যুদ্ধ, IELTS-এর যুদ্ধ এবং অবশেষে বিদেশে চলে যাওয়ার যুদ্ধ।
আমরা তাদের শিখিয়েছি কীভাবে প্রতিযোগিতা করতে হয়। আমরা তাদের শিখিয়েছি কীভাবে প্রথম হতে হয়। আমরা তাদের শিখিয়েছি কীভাবে অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকতে হয়। কিন্তু আমরা তাদের কখনো শেখাইনি কীভাবে শান্তিতে বাঁচতে হয়।
একটি ১৯ বছরের ছেলে যখন ঘুমাতে যায়, তখন তার টেবিলে পড়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের assignment, পাশে IELTS-এর বই, ল্যাপটপে Coursera-এর certificate course এবং মোবাইল ফোনে বন্ধুর scholarship পাওয়ার পোস্ট। সে নিজেকে প্রশ্ন করছে না—"আমি কী হতে চাই?" বরং সে নিজেকে প্রশ্ন করছে—"আমি কি পিছিয়ে পড়ে যাচ্ছি?"
সম্ভবত এটাই এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং চীনের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করা গবেষকদের একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ হলো, অত্যধিক প্রতিযোগিতামূলক সমাজগুলো ধীরে ধীরে তাদের তরুণদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে ফেলে। দক্ষিণ কোরিয়ায় এই সমস্যার নাম "Exam Hell"। জাপানে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে "Karoshi" বা অতিরিক্ত কাজের চাপে মৃত্যুর মতো শব্দ পর্যন্ত তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিন্তু আমরা হয়তো খুব দ্রুত সেই পথেই হাঁটছি।
আজকের Gen Z-দের একটি বড় অংশ নিজেদের পরিচয় নির্ধারণ করে তাদের productivity দিয়ে। আপনি দিনে কত ঘণ্টা পড়াশোনা করেন? কতগুলো skill শিখেছেন? আপনার CV-তে কতগুলো certificate আছে? আপনি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন? আপনার CGPA কত? আপনি বিদেশে যাচ্ছেন কি না?
আমরা এমন একটি সমাজে বাস করছি, যেখানে একজন মানুষের মূল্য প্রায়ই তার মানুষ হিসেবে নয়, বরং তার achievement দিয়ে পরিমাপ করা হয়।
জার্মান-কোরিয়ান দার্শনিক Byung-Chul Han তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Burnout Society-এ লিখেছিলেন, আধুনিক মানুষকে আর কেউ শৃঙ্খল দিয়ে বেঁধে রাখে না। আধুনিক মানুষ নিজেই নিজেকে শোষণ করে। সে নিজেই নিজের মালিক, আবার নিজেই নিজের দাস।
বিষয়টি ভয়ংকরভাবে সত্য।
আজকের একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে কেউ রাত তিনটা পর্যন্ত জেগে skill development করতে বাধ্য করছে না। সে নিজেই করছে। কারণ সে জানে, যদি সে না করে, তাহলে হয়তো পৃথিবীর অন্য প্রান্তে তারই বয়সী আরেকজন তরুণ তা করে ফেলবে।
এই প্রতিযোগিতা কখনো শেষ হয় না।
একটি scholarship পাওয়ার পর শুরু হয় চাকরির চিন্তা। চাকরি পাওয়ার পর শুরু হয় permanent residency-এর চিন্তা। তারপর citizenship-এর চিন্তা। তারপর আরও ভালো salary-এর চিন্তা।
আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করেছি, যারা বিশ্রাম নেওয়ার আগেই নিজেদের অপরাধী মনে করে।
এবং এখান থেকেই জন্ম নেয় Burnout।
Burnout মানে শুধুমাত্র ক্লান্ত হয়ে যাওয়া নয়। Burnout হলো এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন মানুষ নিজের কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। নিজের অর্জনগুলোকে অর্থহীন মনে হতে থাকে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ হারিয়ে ফেলে।
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, Burnout-এর কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণি নেই। এটি একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর হতে পারে, একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের হতে পারে, একজন গবেষকের হতে পারে কিংবা একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীরও হতে পারে।
আমরা যখন মেধাপাচারের কথা বলি, তখন আমরা ধরে নিই সমস্যাটি অর্থনৈতিক। আংশিকভাবে এটি সত্য। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল।
পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলো কখনো তাদের জনসংখ্যার উপর নির্ভর করে উন্নত হয়নি। তারা নির্ভর করেছে বিশ্বের সেরা মেধাগুলোকে নিজেদের দেশে নিয়ে আসার উপর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া কিংবা জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এগুলো পৃথিবীর সেরা মেধাগুলোকে আকর্ষণ করার অন্যতম মাধ্যম।
তারা Brain Gain করছে। আর আমরা Brain Drain-এর কথা বলছি।
একজন বাংলাদেশি তরুণ যখন বিদেশে গবেষণার সুযোগ পায়, উন্নত ল্যাব পায়, যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন পায় এবং নিজের কাজের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়, তখন তাকে শুধুমাত্র "দেশদ্রোহী" বলে সমালোচনা করা খুব সহজ। কিন্তু প্রশ্নটি হওয়া উচিত—আমরা কি তাকে সেই একই সুযোগ দিতে পেরেছিলাম?
মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে যেতে চায় না। মানুষ শুধু এমন একটি জায়গায় বাঁচতে চায়, যেখানে তার মেধা এবং পরিশ্রমের মূল্য দেওয়া হয়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো—আমরা ব্যর্থতাকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে শিখিনি।
বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পায়, তাকে ব্যর্থ মনে করা হয়। চাকরি না পেলে ব্যর্থ। বিদেশে যেতে না পারলে ব্যর্থ। ত্রিশ বছর বয়সে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে ব্যর্থ।
আমরা হয়তো ভুলেই গেছি যে, একজন মানুষের জীবনের কোনো universal timeline নেই।
বিশ্ববিখ্যাত লেখক Malcolm Gladwell তার Outliers বইয়ে দেখিয়েছেন, একজন মানুষের সফলতার পেছনে শুধুমাত্র মেধা কাজ করে না। কাজ করে পরিবেশ, সুযোগ, সামাজিক কাঠামো এবং সময়।
কিন্তু আমাদের সমাজ এখনও বিশ্বাস করে—"পরিশ্রম করলেই সব সম্ভব।"
বাস্তবতা একটু ভিন্ন। পরিশ্রম গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একটি সমাজ যদি তার তরুণদের জন্য যথেষ্ট সুযোগ তৈরি করতে না পারে, তাহলে সেই পরিশ্রম একসময় ক্লান্তিতে পরিণত হয়।
হয়তো এই কারণেই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও নয়। আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো—আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা খুব অল্প বয়সেই নিজেদের স্বপ্নগুলোকে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে শিখে গেছে।
তারা অলস নয়। তারা অকৃতজ্ঞ নয়। তারা দেশবিরোধীও নয়।
তারা শুধু ক্লান্ত।
হয়তো একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কোনো বিলাসবহুল গাড়ি নয়। হয়তো তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো—একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এই অনুভূতিটা পাওয়া যে, "আমি আমার দেশেই আমার ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি।"
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু GDP, মেগা প্রকল্প কিংবা অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত, সেটি বোঝা যায় তার তরুণরা সেই রাষ্ট্রে নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পায় কি না—সেটা দিয়ে।
কারণ ইতিহাস আমাদের বারবার একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—কোনো দেশ রাতারাতি তার মেধাবীদের হারায় না। সে ধীরে ধীরে তার তরুণদের স্বপ্ন হারায়। আর যখন একটি রাষ্ট্র তার তরুণদের স্বপ্ন ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন সে শুধু মানুষ হারায় না; সে তার ভবিষ্যৎও হারাতে শুরু করে।
হয়তো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এখনও মেধাপাচার নয়। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা দেশ ছাড়ার আগেই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে।
তথ্য ও সূত্র:
Byung-Chul Han, The Burnout Society (2015); Malcolm Gladwell, Outliers (2008); Jonathan Haidt, The Anxious Generation (2024); Thomas L. Friedman, The World Is Flat (2005); OECD Education at a Glance Reports; UNESCO Global Education Monitoring Reports; World Bank Human Capital Project Reports; Bangladesh Bureau of Statistics (BBS); বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রে Brain Drain, Youth Burnout ও Skilled Migration বিষয়ক প্রকাশিত তথ্য-উপাত্তের আলোকে রচিত।
